হাদিস শাস্ত্রে ইমাম আবু হানিফা রহ

🌹 প্রিয় নবী সাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর পরবর্তী সময়ে হাদীসে নববীর খেদমত দু’ভাবে চলে আসছে।
১. নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীসকে হুবহু শব্দে কিংবা সমার্থে সংরক্ষণ করা।
২.ঐ হাদীসের মর্মার্থ ও ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের কাজ আঞ্জাম দেয়া।
তন্মধ্যে প্রথম দায়িত্ব পালনকারীদেরকে মুহাদ্দিসীন, আর দ্বিতীয় দায়িত্ব সম্পন্নকারীদেরকে বলা হয় “ফুকাহা”। অন্যভাবে বললে প্রথম দলকে أصحاب رواية আর দ্বিতীয় দলকে أصحاب دراية বলে। চারো ইমাম এই উভয় দ্বায়িত্ব অত্যন্ত সুচারুরূপে পালন করেছেন।
🌹 ইমামে আযম রহঃ-র ইলমে ফিকহের খেদমতের কথা স্ববিস্তারে বলার প্রয়োজনবোধ হচ্ছে না,যেহেতু তা সর্বত্রই পরিব্যাপ্ত হয়ে আছে। ইমাম আবূ হানীফার জীবনী প্রসঙ্গে হাম্বলী মাযহাবের সুপ্রসিদ্ধ মুহাদ্দিস ও হাম্বালী ফকীহ আল্লামা যাহাবী (৭৪৮ হি) প্রসিদ্ধ রহ. একটি কবিতার উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন:
الإمامة في الفقه ودقائقه مسلمة إلى هذا الامام. وهذا أمر لا شك فيه.
وليس يصح في الاذهان شئ : إذا احتاج النهار إلى دليل
‘‘ফিকহ্ ও এর সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বিষয়ে নেতৃত্বের মর্যাদা এ ইমামের জন্য সংরক্ষিত। এতে কোনোই সন্দেহ নেই।যদি দিবসকে প্রমাণ করতে দলিলের প্রয়োজন হয় তবে বুদ্ধি-বিবেক বলে কিছুই থাকে না’’(যাহাবী, সিয়ারু আলামিন নুবালা ৬/৪০৩।)
🌹তাই আমরা এ পর্বে কেবলমাত্র তার হাদীসের জ্ঞান-গরীমার কিছু অংশ নিয়ে আলোচনা করব ইনশাআল্লাহ।
ইমামে আযম রহ. এর ফিকহের খেদমতগুলো যাচাই করলে দেখা যায় যে,তার রচনাবলীতে সত্তর হাজারের অধিক হাদীস রয়েছে।মুহাম্মাদ ইবনে সামাআ বলেন-
ان الامام ذكر فى تصانيفه نيفا وسبعين الف حديث وانتخب الاثار من أربعين ألف حديث .
‘ইমাম আবু হানীফা রহ. তাঁর রচনাবলীতে (তথা যে সকল মাসআলা মাসায়েলকে তিনি তাঁর শাগরেদবৃন্দকে লিখিয়েছেন) সত্তর হাজারের অধিক হাদীস বর্ণনা করেছেন এবং চল্লিশ হাজার হাদীস থেকে ‘কিতাবুল আছার’ নির্বাচিত করে সংকলন করেছেন’।(মোল্লা আলী কারী রহ.মৃত্যু১০১৪হি. সংকলিত ‘মানাকিবুল ইমামিল আ‘যম।পৃ.৪৭৪। এটি আল জাওয়াহিরুল মুযীআর, মীর মুহাম্মাদ কুতুবখানা, আরামবাগ করাচী ১৩৩২ হি. পরিশিষ্টে মুদ্রিত হয়েছে।)
🌹আল্লামা যাফর আহমদ উসমানী রহঃ বলেন, ইবনে হিব্বান তাঁর ‘সহীহ্ ইবনে হিব্বানে’ ‘কিতাবুস সিকাতে’ ও এ গ্রন্থদ্বয় ছাড়া অন্যান্য গ্রন্থে, বায়হাকী তাঁর ‘সুনানে বায়হাকীতে’ ও অন্যান্য গ্রন্থে, তবরানী তাঁর তিন মু‘জামে (অর্থাৎ মু‘জামে কাবীর, মু‘জামে সগীর ও মু‘জামে আওসাত)। দারাকুতনী তাঁর গ্রন্থ সমূহে এবং অন্যান্য ইমামগণ তাঁদের বিভিন্ন গ্রন্থে ইমাম আবু হানীফার সূত্রে বর্ণিত হাদীস উল্লেখ করেছেন। যদি ইমাম আবু হানীফা থেকে বর্ণিত এসকল হাদীসকে আমরা একটি খন্ডে গ্রন্থিত করি তবে তা একটি বিশাল বড় ভলিয়াম হবে। (কাওয়ায়েদ ফি উলুমিন হাদীস, ৩১৬, ৩১৭)
🌹 বিশ্ব বিখ্যাত হাদীসের ইমাম আল্লামা যাহেদ আল কাওসারী রহ. বলেন-
وأما كثرة حديثه فتظهر من حججه المسرودة فى أبواب الفقه ، والمدونة تلك المسانيد السبعة عشر،لكبار الأئمة من أصحابه ، وسائر الحفاظ.

অর্থাৎ ইমাম আবু হানীফার হাদীসের আধিক্যের বিষয়টি ফিকহী বিষয়ে তাঁর উপস্থাপিত ও উদ্ধৃত দলীল সমূহ থেকে এবং তাঁর শীর্ষ পর্যায়ের ইমাম শাগরেদবৃন্দ এবং অন্যান্য হাফিজুল হাদীসদের সংকলিত সতেরটি মুসনাদ গ্রন্থ থেকে সুস্পষ্ট হয়। (ফিকহু আহলিল ইরাক ওয়া হাদীসুহুম এর ‘তরীকাতু আবী হানীফা ফিত তাফকীহ’ শিরোনামের আলোচনার পরিশেষের দিকে দ্র.।)
🌹এথেকে বুঝা যায় যে,ইমাম আবু হানীফা রাহ. ফিকহে ইসলামীর ইমাম হওয়া যেমন মুতাওয়াতির, তেমনি ইলমে হাদীসেও ইমাম হওয়ার যেসব অনিবার্য গুণ ও বৈশিষ্ট্য আছে, সেগুলো তাঁর মধ্যে বিদ্যমান থাকাও মুতাওয়াতির। যার অনিবার্য দাবি হল, তিনি শুধু যাবিত ও মুতকিন রাবীই ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন হাদীস ও সুন্নাহর ইমাম, যাঁরা সাধারণ জরহ-তাদীলের ঊর্ধ্বে হয়ে থাকেন, তাঁরা বরং অন্যদের জরহ-তাদীল করেন।
🌹 “তাযকিরাতুল হুফফায”গ্রন্থটির ব্যাপারে শামসুদ্দীন আযযাহাবী (৭৪৮হি.)রাহ. কিতাবের শুরুতে লিখেছেন-
هذه تذكرة بأسماء مُعَدلي حملة العلم النبوي، ومن يرجَع إلى اجتهادهم في
التوثيق والتضعيف والتصحيح والتزييف.
অর্থাৎ এ গ্রন্থে ইলমে নবুওয়াতের ঐ বিশ্বস্ত ধারক-বাহকগণের আলোচনা রয়েছে, যাদের সিদ্ধান্ত ও গবেষণার শরণাপন্ন হতে হয় ছিকা ও যয়ীফ রাবী নির্ণয় এবং সহীহ ও যয়ীফ হাদীস চিহ্নিত করার ক্ষেত্রে।’
এরপর যাহাবী রাহ. এ গ্রন্থের খন্ড ১ পৃষ্ঠা যে জো১৬৮-এ ইমাম আবু হানীফা রাহ-এর আলোচনা লিখেছেন। এবং আলোচনার শিরোনাম দিয়েছেন‘আবু হানীফা আল-ইমামুল আযম’(أبو حنيفة الإمام الأعظم)
মুয়াফফাক আলমক্কী রাহ. (৫৬৪ হি.) ‘মানাকিবু আবী হানীফা’’ গ্রন্থে (খন্ড ২, পৃষ্ঠা : ১৫১-১৫২)
🌹 আবু ইসমা সা’দ ইবনে মুয়ায রাহ.-এর উদ্ধৃতিতে উল্লেখ করেছেন, তিনি আবু সুলায়মান জুযাজানী থেকে, তিনি ইমাম মুহাম্মাদ রাহ. থেকে, তিনি ইমাম আবু ইউসুফ রাহ. থেকে বর্ণনা করেছেন। ইমাম আবু ইউসুফ বলেন-
كنا نكلم أبا حنيفة في باب من أبواب العلم، فإذا قال بقول واتفق عليه أصحابه درت على مشايخ الكوفة هل أجد في تقوية قوله حديثا أو أثرا؟ فربما وجدت الحديثين أو الثلاثة فآتيه بها، فمنها ما يقبله ومنها ما يرده، فيقول : هذا ليس بصحيح أوليس بمعروف، وهو موافق لقوله! فأقول له : وما علمك بذلك؟ فيقول : أنا عالم بعلم الكوفة.
‘আমরা আবু হানীফা রাহ.-এর সাথে একটি অধ্যায় নিয়ে আলোচনা করতাম। এরপর যখন তিনি সিদ্ধান্ত দিতেন এবং তার সঙ্গীরাও একমত হতেন তখন আমি কুফার শায়েখগণের কাছে যেতাম তার সিদ্ধান্তের সমর্থনে আরো কোনো হাদীস বা আছর পাই কিনা। কখনো দুইটি বা তিনটি হাদীস পেতাম। তাঁর কাছে পেশ করার পর তিনি কোনোটি গ্রহণ করতেন আবার কোনোটি এই বলে বর্জন করতেন যে, এটি সহীহ নয় বা মারুফ নয়। অথচ তা তার সিদ্ধান্তের অনুকূলে। আমি বলতাম, এ সম্পর্কে আপনার ইলম কীরূপ। তিনি বলতেন, আমি কূফা নগরীর ইলমের ধারক।

🌹 অনেকে মনে করেন যে,তিনি হাদীসের ইমাম হয়ে থাকলে তার থেকে হাদীস এত কম বর্ণিত হল কেন?
দেখুন!ইমাম মালেক রহ. কর্তৃক সংকলিত হাদীসের ভাণ্ডার হলো মুয়াত্তা মালিক। এই কিতাবে ৮২২টি মারফু এবং ২৪৪টি মুরসাল হাদীস রয়েছে। ইমাম ইয়াহইয়া আল কাত্তান রহ. তাঁর ব্যাপারে বলেন- كان إماما في الحديث. অর্থাৎ তিনি হাদীস শাস্ত্রের ইমাম ছিলেন। ইমাম আহমদ বিন হাম্বল রহ.ও তাঁর ব্যাপারে বলেছেন- هو إمام في الحديث، وفي الفقه.তিনি হাদীস ও ফিকহের ইমাম ছিলেন।(সিয়ারু আলামিন নুবালা, ইমাম মালেক রহ.এর তরজামা)।
🌹 তার মানে বুঝাগেল,হাদীস বেশি কিংবা কম বর্ণিত হওয়াটাই সর্বক্ষেত্রে ব্যক্তির জ্ঞান-গুণের মাপকাঠি হয় না।বিশেষত এজন্য যে,পূর্ববর্তীগণের মধ্যে যাদের ত্বাকওয়া, পরহেজগারী যত বেশি ছিল,তারা হাদীস সল্পই বর্ণনা করতেন।আর ইমাম আবূ হানিফা রহঃ-র ক্ষেত্রে এ কথাতো চলেই,সাথে সাথে এটাও তার হাদীস কম বর্ণিত হওয়ার অনিবার্য কারণ ছিল যে,তিনি ইসলামী ফিকহ্কেই ব্যস্ততার মূল বানিয়ে নিয়েছিলেন।শুধু হাদীসের ব্যস্ততাই তার মূল কাজ ছিল না।তা ছাড়া তার হাদীসের বর্ণনাও যে অন্যান্য ইমামগণের তুলনায় কম ছিল না,তা তো আমরা উল্লেখ করলাম-ই।
🌹 এরপরও যারা এ প্রশ্ন করতে চান যে,তার হাদীসগুলো বিশুদ্ধ ছয় কিতাবের কোনটিতে নেই কেন?
মূলত যারা এ জাতীয় মন্তব্য করে থাকেন তারা চিন্তাগত ও মৌলিক কিছু ভুলের শিকার। তন্মধ্যে একটি মৌলিক চিন্তাগত ভুল হলো ইমামগণের পরবর্তীতে সংকলিত হাদীস গ্রন্থকে পূর্ববর্তীগণের হাদীস জানা আর না জানার মানদণ্ড স্থির করা। তাই এ সম্পর্কে কিছু কথা আরজ করা হলো-
ক.সর্বজন বিধিত মতানুসারে বিখ্যাত ছয় কিতাবের পূর্বেও গ্রন্থাকারে হাদীস সংরক্ষিত, পঠিত ও পরিচিত ছিল। সেকালের হাদীসের ইমামগনের পাঠদানের ফলে মক্কা- মদীনা থেকে শুরু করে সুদূর মিশর পর্যন্ত হাদীসের চর্চা প্রাতাষ্ঠানিকতায় পৌঁছে গিয়েছিল। পরবর্তী কালের ইমাম ও মুহাদ্দিসগণ সেই আলোকেই নিজেদেরকে আলোকিত করার প্রয়াস পেয়েছেন।যেমন মুয়াত্তা মালেক,জামে‘সুফিয়ান সাওরী,মুসান্নাফে আব্দু রাজ্জাক,মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা প্রভৃতি গ্রন্থাদি।
খ. চার মাযহাবের প্রধান দুই ইমামের মৃত্যুর সময় ইমাম বুখারী ও ইমাম মুসলিমসহ ছয় কিতাবের লেখকগণের মধ্যে কারোই জন্ম হয় নি! সুতরাং তাঁদের কাল ও রচনা দিয়ে অন্তত ইমাম আবু হানীফা রহ. ও ইমাম মালেক রহঃ কে বিচার করা বোকামি ছাড়া আর কিছুই হবে না। বরং একথা দিবালোকের ন্যায় স্পষ্ট যে,- তাঁদের অবিরাম সাধনা যদি হাদীস ও ফিকাহকে প্রতিষ্ঠিত ও প্রাতিষ্ঠানিকতায় পৌঁছে না দিত, তাহলে বুখারা, নিশাপুরে হাদীসের প্রদীপ জ্বলতো না। উদাহরণত ইমাম মুহাম্মাদ রহ.এর শীর্ষ পর্যায়ের শিষ্য হলেন ইমাম আবু হাফস কাবীর হানাফী রহ.। জামে‘সুফিয়ান সাওরীর মাধ্যমে যার কাছে ইমাম বুখারীর সর্বপ্রথম হাদীস শিক্ষার বিসমিল্লাহ হয় ।
🌹এ বব্যাপারে শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমিয়্যাহ রহঃ বলেন-
بل الذين كانوا قبل جمع هذه الدواوين كانوا أعلم بالسنة من المتأخرين بكثير … فكانت دواوينهم صدورهم التي تحوي أضعاف ما في الدواوين, وهذا أمر لا يشك فيه من علم القضية.
(হাদীস ও সুন্নাহর) এই সব গ্রন্থ সংকলনের পূর্ববর্তী (ইমাম)গণ পরবর্তীদের তুলনায় হাদীস ও সুন্নাহ অনেক বেশি জানতেন…। তাদের গ্রন্থ তো ছিল তাদের সীনা, যাতে এইসব গ্রন্থের তুলনায় হাদীস ও সুন্নাহ অনেক অনেক গুণ বেশি পরিমাণে সংরক্ষিত ছিল। এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অবগত কোনো ব্যক্তিই সন্দেহ পোষাণ করতে পারে না। (মাজম্উূল ফাতাওয়া ২০/২৩৯)
🌹এ সন্দেহের গোড়া কর্তনে আসহাবুত তারজীহদের ভূমিকাও অনস্বীকার্য-
ইমামদের কাছে অনেক হাদীস পৌঁছে নি বা তারা হাদীস কম জানতেন -আজকে যারা এ জাতীয় সন্দেহ পোষণ করতে চান, বহু পূর্বেই মনীষীগণ তাদের এ সন্দেহের গোড়া কেটে দিয়েছেন। হানাফী বড় বড় মুহাদ্দিস ও ফকীহ- যাদেরকে আসহাবুত তারজীহ (অগ্রগণ্য আখ্যা দেওয়ার ক্ষেত্রে অভিজ্ঞ) বলা হয়,তারা হানাফি ইমামগণের মাসআলাগুলোকে সহিহ হাদীসের মানদণ্ডে এনে কোথাও তারা ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মাদের মতকে,কোথাও দু’জনের একজনের মতকে,কোথাও আবার ইমাম যুফার বা হাসান ইবনে যিয়াদের মতকে অগ্রগণ্য আখ্যা দিয়েছেন। অতএব ইমাম আবু হানীফার কাছে হাদীস পৌঁছে নি মর্মে হানাফী মাযহাবের প্রতি অনস্থা সৃষ্টির আর কোন সুযোগ তাঁরা বাকী রেখে যান নি।
🌹 ইমাম আবু হানীফার বিষয়টি আলোচনার আগে কিছু প্রসঙ্গিক আলোচনা করে নিই । তাহলে বিষয়টি বুঝতে আমাদের জন্য সহজ হবে।
সাহাবীদের ক্ষেত্রেও কখনো এমন ঘটেছে যে, সংশ্লিষ্ট বিষয়ের হাদীস তাঁদের কারো কারো কাছে পৌঁছেনি। নমুনা স্বরূপ নিম্নে একটি ঘটনা উল্লেখ করা হলো।
ঘটনাটি জালুলা যুদ্ধের।
আব্দুল্লাহ বিন উমর রা. সা’দ বিন আবু ওয়াক্কাস রা.কে চামড়ার মোজার উপর মাসেহ করতে দেখে আশ্চার্যান্বিত হয়েছিলেন এবং আপত্তি করেছিলেন। (দেখুন কিতাবুল আছার হাদীস নং ৮) আব্দুল্লাহ্ বিন উমর রা. সা’দ বিন আবী ওয়াক্কাস রা. এর মোজা মাসেহের ব্যাপারে আপত্তি করার কারণ হলো, তিনি অনেক আগে ইসলাম গ্রহণ করা সত্বেও এবং অনেক হাদীস বর্ণনা করা সত্বেও তাঁর কাছে মোজা মাসেহ্ সংক্রান্ত হাদীস পৌঁছে নি। হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানী রহ. বলেন, এ হাদীসের মধ্যে এ শিক্ষা রয়েছে যে, প্রবীণ সাহাবীর কাছে শরীয়াতের সুষ্পষ্ট বিষয় কখনো কখনো জানা নাও থাকতে পারে। যে বিষয় অন্যের জানা রয়েছে। (দেখুন ফতহুল বারী -বাবুল মাসহি আলাল খুফফাইন )।
সালফে সালেহীনদের থেকে এরূপ কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা রয়েছে যে, কিছু কিছু বিষয়ের হাদীস তাঁদের কারো কারো কাছে পৌছে নি। তো এরূপ বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা দিয়ে ব্যক্তিকে মাপা যায় না। ব্যক্তিকে মাপতে হয় সামগ্রিক বিচারে।
ইমাম আবু হানীফার ক্ষেত্রেও বিষয়টি এভাবেই চিন্তা করতে হবে।সামগ্রিক বিচারে কিছু কিছু ক্ষেত্রে হানাফী বড় বড় মুহাদ্দিস ও ফকীহ্ – যাদেরকে আসহাবুত তারজীহ (অগ্রগণ্য আখ্যা দেওয়ার ক্ষেত্রে অভিজ্ঞ) বলা হয়- চিহিৃত করেছেন যে, সেসব ক্ষেত্রে ইমাম আবু হানীফার নিকট সহীহ হাদীস পৌঁছেনি। এগুলো স্বল্প পরিসরের কিছু বিচ্ছিন্ন ও ব্যতিক্রম ঘটনা।এগুলোর সংখ্যা অতি সামান্য।
তবে এপরিমান হাদীস জানা না থাকাটা,তার মুজতাহিদ হওয়ার প্রতিবন্ধক কোন বিষয় নয়।
🌹ইমাম ইবনে তায়মিয়া রহ.বলেছেন-
ولا يقولن قائل من لم يعرف الأحاديث كلها لم يكن مجتهدا لأنه ان اشترط فى المجتهد علمه بجميع ما قاله النبى وفعله فيما يتعلق بالأحكام فليس في الأمة مجتهد وانما غاية العالم أن يعلم جمهور ذلك ومعظمه بحيث لا يخفى عليه إلا القليل من التفصيل ثم انه قد يخالف ذلك القليل من التفصيل الذى يبلغه
যার মর্মানুবাদ হলো- মুজতাহিদের ক্ষেত্রে যদি এরূপ শর্তারোপ করা হয় যে, নবীজীর সব ইরশাদ এবং আহকামের সাথে সংশ্লিষ্ট সব আমলই মুজতাহিদের জানা থাকতে হবে, তাহলে এই উম্মতের মধ্যে এমন মুজতাহিদ পাওয়া যাবে না।… তবে এক,দুটা বাদে সিংহভাগ হাদীসই তাঁর জানা থাকতে হবে।
(মাজম্উূল ফাতাওয়া ২০/২৩৯)
🌹তাছাড়া যারা ইমামদের কাছে হাদীস না পৌছার কথা বলেন,তারা তো কেবলমাত্র সুপ্রসিদ্ধ মাসআলার ক্ষেত্রেই একথার প্রয়োগ করতে চান।অথচ এসকল মাসআলায় সহিহ হাদীস তাদের কাছে পৌছার ব্যাপারে কোনরূপ সন্দেহের অবকাশ নেই।



মুহাদ্দিসগণের দৃষ্টিতে ইমাম আবু হানীফাঃ

🌹ইমাম বোখারীর অন্যতম উস্তাদ মক্কী বিন ইব্রাহীম রহ. মৃতু- ২১৫হিঃ

মক্কী বিন ইব্রাহিমের সনদে ইমাম বুখারী অধিকাংশ ‘সুলাসিয়্যাত’ বা তিন সনদের হাদীসগুলো বর্ণনা করেছেন। মক্কী বিন ইব্রাহিম ইমাম আবু হানীফার ছাত্র। তিনি ইমাম আবু হানীফা সম্পর্কে বলেন, “আবু হানীফা তাঁর সময়কালের শ্রেষ্ঠ আলেম ছিলেন”।
দেখুন ‘মানাক্বেবে ইমাম আজম’ ১/৯৬পৃ, হাফিয মিযযী রহ.-র বক্তব্য দেখুন ‘তাহ্যীবুত তাহযীব’-র টিকা ১০/৪৫২পৃ.

এখানে একটি কথা বিশেষভাবে স্মরণ রাখতে হবে, প্রাচীন আলিমগণ ‘ইলম’ বলতে ‘ইলমে হাদীস’ই বুঝাতেন। তাই ইমাম আবু হানীফাকে বড় আলিম বলার অর্থ- ‘হাদীস শাস্ত্রের বড় আলিম’ এতে কোন সন্দেহ নেই।

🌹শাইখুল ইসলাম ইয়াযিদ বিন হারুন বলেন-
قال شيخ الإسلام يزيد بن هارون-كان ابو حنيفة نقيا تقيا زاهدا عابدا عالما صدوق اللسان احفظ اهل زمانه، (مناقب ابى حنيفة لمحمد ضميرى)
ইমাম আবু হানীফা রহঃ অত্যন্ত মুত্তাকী, পবিত্র সাধক, ইবাদত গুজার, আলিম, সত্যভাষী, এবং সমসাময়িক সকলের চেয়ে হাদীসের বড় হাফেজ ছিলেন।
মানাকেবে ইমাম আবু হানীফা রহঃ মুহাম্মদ জমিরী রচিত দ্রঃ.

🌹হাফেজ আবু নুয়াইম ইসফাহানী রহঃ ইয়াহইয়া বিন নাসর বিন হাজার এর সূত্রে বর্ণনা করেন-
قال الحفظ ابو نغيم الإسفحانى عن يحيى بن يصر بن حجر- دخلت على ابى حنيفة رح فى بيت مملوكتها، فقلت- ما هذه؟ قال هذه احاديث كلها، وما حدثت به الا اليسير الذى منتفغ به- (الخيرات الحسان-211 بحوالة مناقب ابى حنيفة للمرقف المكى-85)
আমি কিতাবে ভরপুর একটি গৃহে ইমাম আবু হানীফা রহ এর নিকট প্রবেশ করলাম। তাঁকে জিজ্ঞাসা করলাম এ কিতাবগুলো কিসের? উত্তরে তিনি বললেন-এ সবই হাদীসের কিতাব। এর সামান্য কিছুই আমি বর্ণনা করেছি। যার থেকে যথেষ্ট পরিমাণে উপকৃত হওয়া যায়।
আল খাইরাতুল হিসান-২১১পৃ.

🌹ইয়াহইয়া বিন নাসর রহৎ বলেন-
قال يحيى بن نصر سمعت ابا حنيفة رح يقول- عندى صناديق من الحديث ما اخرجت منها الا اليسير الذى ينتقع به- (عقود الجواهر المنيفة-1/23، مناقب ابى حنيفة للمرفق المكى-85)
আমি ইমাম আবু হানীফা রহঃ কে বলতে শুনেছি যে, তিনি বলেন- আমার নিকট হাদীসের সিন্দুক আছে। আমি তা থেকে উপকারজনক অল্প কিছুই প্রকাশ করেছি।
উকুদুল জাওয়াহিরুল মুনীফাহ-১/২৩পৃ.

🌹ইমাম আবু দাউদ বলেন,
নিঃসন্দেহে আবু হানীফা ছিলেন একজন শেষ্ঠ ইমাম।
তাহজীব ১/৪৪৫পৃ.

🌹জরাহ তাদিলের (সনদ পর্যালোচনা শাস্ত্র) অন্যতম ইমাম ইয়াহ্‌ইয়া ইবনে মুঈন (মৃতু- ২৩৩হিঃ) বলেন, আবু হানীফা ছিলেন হাদীস শাস্ত্রের গ্রহণযোগ্য ব্যক্তি।
তাহবীবুত্তাহজীব ৫/৬৩০পৃ.

🌹জারাহ তাদিলের বিজ্ঞ ব্যক্তি আলী ইবনুল মাদীনী (মৃতু- ২৩৪ হিঃ) বলেন,“আবু হানীফা হাদীস শাস্ত্রে গ্রহণযোগ্য ব্যক্তি। তার মধ্যে কোন দোষক্রুটি ছিল না।
জামিউ বয়ানিল ইলম ২/১০৮৩পৃ.

🌹প্রসিদ্ধ মুহাদ্দিস হাফিজ ইয়াহ্ইয়া বিন হারুন মৃতু- ২০৬হি. বলেন,আবু হানীফা ছিলেন সমকালীন শ্রেষ্ঠতম জ্ঞানী ও সত্যবাদী।
আহবারে আবু হানীফা ৩৬পৃ.

🌹আল্লামা হাফিয ইবনে হাজার আসক্বালানী রহ. বলেন-ইমাম আবু হানীফা রহ.-র মুত্যু সংবাদ শুনে ফিক্বাহ ও হাদীস শাস্ত্রের সুপ্রসিদ্ধ ইমাম, শাফঈ মাযহাবের প্রধানতম সংকলক হযরত ইবনে জরীহ রহ. গভীর শোক প্রকাশ করে বলেছিলেন,“আহ! ইলমের কি এক অফুরন্ত খনি আজ আমাদের হাতছাড়া হলো।
তাহযীবুত্তাহযীব খন্ড ১/৪৫০পৃ.

🌹একবার হযরত ইয়াহয়া ইবনে মাঈনকে প্রশ্ন করা হলো- হাদীসশাস্ত্রে আবু হানীফা রহ. কি আস্থাভাজন ব্যক্তি?(সম্ভবতঃ প্রচ্ছন্ন সংশয় আঁচ করতে পেরে দৃপ্তকন্ঠে তিনি উত্তর দিলেন-)হ্যা, অবশ্যই তিনি আস্থাভাজন! অবশ্যই তিনি আস্থাভাজন!
মানাকিবুল ইমামমুল আ’যামি লিলমাওয়াফিক ১/১৯২.

ইমাম আবু হানিফা রহঃ রচিত কিতাবসমুহ-

🌹 কোনো কোনো আলিম ও গবেষক দাবি করতেন যে, ইমাম আযম কোনো গ্রন্থ রচনা করেন নি। হিজরী ষষ্ঠ শতকে প্রসিদ্ধ শাফিয়ী ফকীহ ও দার্শনিক ইমাম ফাখরুদ্দীন রাযী ৫৪৪-৬০৬হি. তাঁর রচিত মানাকিবুশ-শাফিয়িয়্যা গ্রন্থে এ ধারণা ব্যক্ত করেছেন যে, ইমাম আবূ হানীফা -র রচিত কোন গ্রন্থই বিদ্যমান নেই।
সম্পাদনা পরিষদ, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, ইসলামী বিশ্বকোষ ২/১৭২-১৭৭.

পক্ষান্তরে অন্যান্য অনেক আলিম তাঁর রচিত কয়েকটি গ্রন্থের কথা উল্লেখ করেছেন। মূলত ইমাম আবূ হানীফার যুগের আলিমগণ সাধারণত প্রচলিত পরিভাষায় গ্রন্থ রচনা করতেন না, বরং তাঁরা যা বলতেন তা ছাত্ররা লিখতেন। এজন্য তাবিয়ী যুগে বা ১৫০ হিজরী সালের মধ্যে মৃত্যুবরণকারী আলিমদের লেখা বা সংকলিত পৃথক গ্রন্থাদির সংখ্যা খুবই কম। তাঁদের ছাত্রগণের লেখাই তাঁদের বক্তব্য সংকলিত। কখনো কোনো ছাত্র তাঁদের বক্তব্য একক পুস্তিকায় সংকলন করতেন। কখনো তাঁরা নিজেরাই কিছু তথ্য সংকলন করতেন। ইমাম আবূ হানীফার লেখা বলতে কখনো তাঁর নিজের সংকলন এবং কখনো তাঁর কোনো ছাত্র কর্তৃক তাঁর বক্তব্য বা তাঁর বর্ণিত হাদীস সংকলন বুঝানো হতে পারে। উভয় ক্ষেত্রেই তা ‘ইমাম আবূ হানীফা’-র নামে প্রচারিত হতে পারে।

🌹যেমন ইমাম বুখারী তার সংকলিত বুখারী শরীফের পান্ডুলিপি লিখিয়েছেন তার ছাত্র মুহাম্মদ বিন ইউসুফ ফারাবরীর দ্বারা। তারপর থেকে বর্তমানে পাওয়া বুখারী শরীফ মূলত মুহাম্মদ বিন ইউসুফ ফারাবরী রহঃ এর লিখিত বুখারী শরীফ-ই। অথচ কিতাবটির ব্যাপারে আমরা বলি যে, এটি ইমাম বোখারী রহঃ রচিত। যেহেতু এর মূল সংগ্রাহক হলেন ইমাম বুখারী, যদিও লিখেছেন তার ছাত্র।
তেমনি ইমাম আবু হানীফার বলা ও উদ্ভাবন করা মাসআলাই তার ছাত্র ইমাম আবু ইউসুফ রহঃ, ইমাম মুহাম্মদ রহঃ, ইমাম হাসান বিন যিয়াদ রহঃ, ইমাম কারখী রহঃ, তাদের কিতাবে সংকলিত করেছেন। তাই তাদের রচিত কিতাব মূলত ইমাম আবু হানীফা রহঃ এর-ই লিখিত কিতাব।

🌹 এই মূলনীতির ভিত্তিতে ইমাম আবূ হানীফা রচিত ও সংকলিত গ্রন্থাদির ব্যাপারে ৪র্থ-৫ম হিজরী শতকের প্রসিদ্ধ ঐতিহাসিক ইবন নাদীম মুহাম্মাদ ইবন ইসহাক ৪৩৮ হি. বলেন:
وله من الكتب كتاب الفقه الأكبر، كتاب رسالته الى البتي، كتاب العالم والمتعلم رواه عنه مقاتل، كتاب الرد على القدرية
তাঁর রচিত গ্রন্থগুলোর মধ্যে রয়েছে:
(১) আল ফিকহুল আকবার,
(২) উসমান আল-বাত্তীকে লেখা চিঠি,
(৩) আল-আলিম ওয়াল-মুতাআল্লিম, গ্রন্থটি মুকাতিল তাঁর থেকে বর্ণনা করেছেন,
(৪) আর-রাদ্দ আ’লাল-কাদারিয়াহ(বা আল-ফিকহুল আকবার।(ইবনে তাইমিয়া, মিনহাজুস সুন্নাতিন নাবাবিয়্যাহ ৩/৮৩,আলিম ওয়াল মুতাআল্লিম-এর ভূমিকায় আল্লামা যাহিদ কাওসারীর আলোচনা, পৃ ৪)।
(৫)কিতাবুল আসার।
হাসান বিন যিয়াদ রহঃ বলেন-قال الحسن بن زياد قد انتخب ابو حنيفة “كتاب الأثار” من اربعين ألف حديث، (الخيرات الحسان-211 بحوالة مناقب ابى حنيفة للمرقى-84)
ইমাম আবু হানীফা রহঃ চল্লিশ হাজার হাদীস থেকে বাছাই করে “কিতাবুল আসার” নামক গ্রন্থটি সংকলন করেন।
আল খাইরাতুল হিসান-২১১পৃ.
এ যাবৎ সংক্ষিপপ্ত আলোচনা থেকে ইমাম আ’যম রহঃ সম্পর্কে আশা করি আমরা সামান্য ধারণ পেয়ছি।

‘হাদীস বিশুদ্ধ হলেই তা আমার মাযহাব’:
🌹এবার আলোচনার সাথে প্রসঙ্গত একটি শংসয় ও সমাধান উল্লেখ করা মুনাসিব মনে হচ্ছে,তা হল-ইমাম আ’যম রহঃ-র নামে প্রচারিত উক্তি-“হাদীস সহীহ হলেই তা আমার মাযহাব”।
কথাটি প্রসঙ্গে দীর্ঘ আলোচনায় না যেয়ে সংক্ষিপ্ত কিছু কথা আরজ করছি-
আমাদের অনেক ভাইয়েরা মনে করেন,মানুষকে মাযহাব ছেড়ে হাদীসের উপর আমল করতে হবে।তারা বলে থাকেন যে,ইমাম আবু হানীফা রহঃ বলেছেন, “যদি হাদীস সহীহ প্রমাণিত হয়, তো সেটিই আমার মাযহাব”।
সুতরাং তোমরা যদি তোমাদের মাযহাবের কিতাবে লিখিত মাসআলা ত্যাগ করে এই হাদীসের উপর আমল কর, তাহলে সরাসরি হাদীসের উপর আমল হল।কারণ সব সহিহ হাদীস-ই হচ্ছে ইমাম সাহেব রহঃ -র মাযহাব।অন্যথায় না হাদীসের উপর আমল হবে, না মাযহাবের উপর।
🌹তাদের সাধারণ এ বক্তব্যে জনসাধারণও দীনের উপর আমল করতে গিয়ে কিছুটা ইতস্ততবোধ করছেন।যেজন্যে জনসাধারণ স্বভাবতই তাদের ধর্মিও মূল্যবোধ থেকে ব্যাপারটাকে এক্সেপ্ট করতে ইচ্ছুক হয়ে যাচ্ছেন।এমতাবস্থায় উম্মাহর দায়িত্ববান ব্যক্তিবর্গের উপর এসকল প্রশ্নের সঠিক জবাব বলা ও লিখা অতীব জরুরী বলে মনে হচ্ছে।নিম্নে দু’চারটি পয়েন্ট তুলে ধরার চেষ্টা করা হল,
১. প্রথম কথা হল,”হাদীস সহিহ বলে প্রমাণিত হলেই তা আমার মাযহাব”কথাটি ইমাম আবু হানিফা রহঃ-র নয়।এটি ইমাম আবু হানীফা রহঃ-র হওয়ার মর্মে কোন প্রমাণ আমরা পাইনি।যদিও কথাটি বাস্তব এবং সকল ইমামগণের সহৃদয়ের কথা।তবে কথাটি হচ্ছে ইমাম শাফেয়ী রহঃ-র।

২. “হাদীস সহীহ হলেই তা আমার মাযহাব”কথাটি যারা সচারাচার বলে থাকেন,তারা কেবলমাত্র প্রসিদ্ধ মতভেদপূর্ণ মাসায়েলের ক্ষেত্রেই এথাটি ব্যবহার করে থাকেন। অথচ এসব ক্ষেত্রে সহীহ হাদীসগুলো ইমামদের নিকট পৌঁছার ক্ষেত্রে কোনরূপ সন্দেহের অবকাশ নেই।তারা হাদীসগুলোর বিশুদ্ধতার ব্যাপারে ভাল করেই জানতেন।তাই অন্তত এসব মাসআলার ক্ষেত্রে”হাদীস সহীহ হলেই তা আমার মাযহাব”কথাটিকে ব্যাবহারের সুযুগ নেই।

৩. “সহীহ” শব্দটি একটি পারিভাষিক শব্দ।মুতাকাদ্দিমীন(পূর্ববর্তী)ইমামগণের পরিভাষায় এর এক অর্থ ছিল,আর মুতাআখখিরীন বা পরবর্তী ইমামগণের পরিভাষায় তা ভিন্ন অর্থে ব্যাবহার হয়।মুতাকাদ্দিমীনদের পরিভাষায় সহীহ বলা হতো, যে বিষয়টির আমল উম্মতের ফুকাহাগণ গ্রহণ করে নিয়েছেন,সে হাদীসটি-ই সহিহ হাদীস।সনদ বিবেচনায় তা আর যাই হোক না কেন।যেজন্যে ইমাম শাফেয়ী রহঃ “ওয়ারিশদের জন্য কোন অসিয়ত নেই”হাদীসটি সনদের বিবেচনায় যয়ীফ হওয়া সত্বেও তিনি হাদীসটি দ্বারা কোরআনুল কারীমের আয়াত”তোমাদের কারো মৃত্যু উপস্থিত মূহুর্তে,পিতা-মাতা ও নিকটাত্মীয়দের জন্য ওসীয়ত করাকে ফরয করা হয়েছে,যদি সে সম্পদ রেখে যায়”আয়াতটিকে রহিত বলেছেন,এই বলে যে,হাদীসটিকে উম্মত ব্যাপকভাবে গ্রহণ করে নিয়েছে।
ইমাম শাফেয়ী রচিত”কিতাবুলল উম্ম”দ্রষ্টব্য.
তার মানে বুঝাগেল,পূর্ববর্তীগণ হাদীসকে আমলযোগ্য হওয়ার ক্ষেত্রে বিশুদ্ধতা যাচাই করতেন এ বিবেচনায় যে,হাদীসটির উপর কতজন ফকীহ আমল করছেন।সনদ দেখে নয়।
আর যেহেতু ইমাম আবু হানীফা মুতাকাদ্দিমীন তথা পূর্ববর্তীগণের অন্তর্ভুক্ত, তাই তার “হাদীস সহীহ” বলার দ্বারা উদ্দেশ্য হল, যে হাদীসের উপর আমল উম্মতের মুহাদ্দিস ও উলামাগণ জারি রেখেছেন।তাই “হাদীস সহীহ হলেই তা আমার মাযহাব”উক্তিটির অর্থ দাড়াবে এই যে,উম্মতের ফুকাহা ও উলামাগণ যে হাদীসটির আমলকে গ্রহণ করে নিয়েছেন,অথচ তা এখনো আমি জানতে পারিনি,সেটি যদি তোমরা জানতে পারো,তবে তোমরা সে অনুযায়ী আমল করবে,কারণ সেটাই আমার মাযহাব।অর্থাৎ তোমরা আমার এ মাযহাবের বিপুরীত কোন ভিন্ন আমলকে মুতাওয়াতির পেলে তোমরা সেটাকেই গ্রহণ করো।
আর মুতাআখখীরিন বা পরবর্তী উলামাগণের পরিভাষায় সহিহ বলা হয়,যে হাদীসটি নির্ভরযোগ্য সনদে বর্ণিত।তাই দুই পরিভাষাকে এক এক অর্থে ব্যবহার করে ফেলতে চাওয়া ইলমী খেয়ানতের শামিল।

কথাটির সঠিক অর্থ:
রেওয়ায়েত ও হাদীস দ্বারা দলীল পেশ করার ক্ষেত্রে ইমাম আবু হানীফা রহ.তাঁর স্বীয় কর্মপদ্ধতি এভাবে উল্লেখ করেছেন-انى أخذ بكتاب الله اذا وجدت
রেওয়ায়েত ও হাদীস দ্বারা দলীল পেশ করার ক্ষেত্রে ইমাম আবু হানীফা রহ.তাঁর স্বীয় কর্মপদ্ধতি এভাবে উল্লেখ করেছেন-
انى أخذ بكتاب الله اذا وجدته ومالم أجده فيه أخذت بسنة رسول الله صلى الله عليه وسلم و الأثار الصحاح عنه التى فشت فى أيدى الثقات .
অর্থ : আমি কিতাবুল্লায় বিধান পেলে তা সিদ্ধান্ত হিসাবে গ্রহণ করি। তাতে না পেলে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সুন্নাহ এবং তাঁর ঐ সকল সহীহ হাদীস থেকে যা নির্ভরযোগ্য রাবীদের মাধ্যমে প্রচারিত হয়েছে।
ছয়মারী, আখবারু আবী হানীফা ওয়া মানাকিবুহু।
অতএব এ হিসাবে ইমাম আবু হানীফা রহ. যত মাসআলার সমাধান দিয়েছেন, সহীহ হাদীস অনুসারেই দিয়েছেন।

🌹এরপর কথা হল,‘হাদীস সহীহ হলেই তা আমার মাযহাব’বক্তব্যটির সম্বোধিত ব্যক্তি কারা? অর্থাৎ ইমামগণ এ বক্তব্য কাদেরকে উদ্যেশ্যে বলেছেন?
উত্তর: এ বক্তব্যের সম্বোধিত ব্যক্তিগণ হলেন মুজতাহিদ পর্যায়ের আলেমগণ।অর্থৎ যে ব্যক্তি মুজতাহিদ ইমামগণের মত ছেড়ে ঐ সহীহ হাদীস অনুসারে আমল করবেন তাকে অবশ্যই মুজতাহিদ পর্যায়ের আলেম হতে হবে অথবা এ সিদ্ধান্তদাতা মুজতাহিদ পর্যায়ের আলেম হতে হবে।
আল্লাহ তায়লা আমাদের সকলকে সহিহ কে বুঝার ও আমল করার তাওফিক দান করুন,আমীন।

তারিখ, ৮/৬/২০১৯ইং
সময়: রাত ৯:১৬

সংকলনে, ইমদাদুল্লাহ।
শিক্ষক: জামিয়া এমদাদিয়া, শ্রীপুর, হোমনা, কুমিল্লা। তথ্যের প্রয়োজনে: 01936769572

ফেস দ্যা ইসলাম ‘আস-সাহাবাহ ফাউন্ডেশন’-র অনলাইন কার্যক্রমের একাংশের প্রতিনিধিত্ব করে।

Leave a Comment